দুর্গাপূজা আজ বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব। পাঁচ দিনের এই মহোৎসব এখন শুধু ধর্মীয় রীতি নয়, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিল্পকলার মিলিত রূপ। তবে এর পেছনে রয়েছে অনেক অজানা ইতিহাস ও বিস্ময়কর তথ্য, যা আমরা অনেকেই জানি না। আসুন, সেইসব তথ্যের সন্ধান করা যাক—
১. বারোয়ারি দুর্গাপূজোর জন্মকথা
প্রথমে দুর্গাপূজা হতো জমিদার ও অভিজাত পরিবারের ব্যক্তিগত বাড়িতে। কিন্তু সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ সীমিত ছিল। ১৭৯০ সালে হুগলির গুপতিপাড়ায় কয়েকজন তরুণ বন্ধু সিদ্ধান্ত নেন যে পূজা হবে সকলের জন্য। তারা ছিলেন ১২ জন বন্ধু, যাদের বলা হতো “বারো ইয়ার”। তাদের উদ্যোগে শুরু হয় প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপূজা। এখান থেকেই আজকের সার্বজনীন কমিউনিটি পূজার সূচনা।
২. কলকাতায় প্রথম দুর্গাপূজো
কলকাতায় দুর্গাপূজার ইতিহাসও সমান চমকপ্রদ। অনেকেই মনে করেন শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজাই প্রথম, কিন্তু আসলে কলকাতায় প্রথম দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয় ১৬১০ সালে সুবর্ণবানিক সব্যসাচী পরিবারের উদ্যোগে। তবে সত্যিই জনপ্রিয়তা পায় শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজা, যা রাজা নবকৃষ্ণ দেব ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর শুরু করেন।
৩. থিম-প্যান্ডেলের বিস্ময়কর উত্থান
আজ দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ হলো থিম-ভিত্তিক প্যান্ডেল। কিন্তু এর সূচনা হয়েছিল অনেক আগেই। ১৯১০ সালের আশেপাশে কলকাতার বাগবাজার ও কুমোরটুলির কয়েকটি পূজায় প্রথমবারের মতো থিম ব্যবহার করা হয়। তবে পূর্ণাঙ্গ থিম সংস্কৃতি জনপ্রিয় হয় ১৯৯০-এর দশকে। আজ কলকাতা ও বাংলার প্রায় প্রতিটি পূজা আলাদা থিমে সাজানো হয়—কখনো পুরাকীর্তি, কখনো সামাজিক বার্তা, কখনো আধুনিক শিল্পকলা।
৪. ঢাকের তাল ও তার রহস্য
দুর্গাপূজা মানেই ঢাক। কিন্তু ঢাক বাজানোর তাল প্রতিদিন আলাদা হয়। ষষ্ঠীর ঢাক আলাদা সুরে বাজে, সপ্তমীর সকালে অন্য রকম, আবার সিঁদুর খেলায় বাজানো ঢাক একেবারেই ভিন্ন সুরে বাজে। প্রতিটি তালের সঙ্গে যুক্ত থাকে বিশেষ ধর্মীয় তাৎপর্য, যা পূজার আবহকে আরও গাঢ় করে তোলে। কখনো মন দিয়ে শুনেছেন কি?
৫. কুমোরটুলি: প্রতিমা তৈরির প্রাণকেন্দ্র
আজ কলকাতার কুমোরটুলি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিমা তৈরির জায়গা। এখান থেকে প্রতিমা যায় আমেরিকা, ইউরোপ, এমনকি আফ্রিকার দেশগুলোতেও। কিন্তু জানেন কি, এই কুমোরটুলি তৈরি হয়েছিল ১৮শ শতকে? জমিদাররা একত্রে কুমোরদের জন্য জায়গা নির্ধারণ করেছিলেন, যাতে তারা দুর্গা প্রতিমা তৈরি করতে পারেন। সেখান থেকেই গড়ে ওঠে আজকের কুমোরটুলি।
৬. দুর্গাপূজা ও ব্রিটিশ প্রভাব
পলাশীর যুদ্ধের পর রাজা নবকৃষ্ণ দেব যখন দুর্গাপূজা শুরু করেন, তখন তিনি ব্রিটিশদের আমন্ত্রণ জানাতেন। ইংরেজ সাহেবরা সেই পূজায় অংশ নিতেন এবং মদের আসর বসাতেন। দুর্গাপূজা তাই একসময় রাজনৈতিক ও সামাজিক মিলনমেলার ক্ষেত্রও হয়ে ওঠে।
৭. UNESCO স্বীকৃতি
২০২১ সালে ইউনেস্কো দুর্গাপূজাকে Intangible Cultural Heritage of Humanity হিসেবে ঘোষণা করে। এর ফলে দুর্গাপূজা এখন শুধুমাত্র বাংলার উৎসব নয়, বরং আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃত একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
৮. দুর্গাপূজার অর্থনীতি
একটি চমকপ্রদ তথ্য হলো, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর প্রায় ৫০,০০০ কোটি টাকার অর্থনীতি গড়ে ওঠে। প্যান্ডেল, আলোকসজ্জা, প্রতিমা, বিজ্ঞাপন, পর্যটন—সব মিলিয়ে এই উৎসব বাংলার অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখে।
দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাঙালির প্রাণের উৎসব। গুপতিপাড়ার বারোয়ারি পূজা থেকে শুরু করে আজকের থিম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত উৎসব—দুর্গাপূজা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ইতিহাস তৈরি করছে। শিল্প, সংস্কৃতি, ভক্তি ও আনন্দের মেলবন্ধনেই দুর্গাপূজা বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব হয়ে উঠেছে।